সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা যায় এক প্রবাসী বাংলাদেশি সৌদিতে বসবাসরত একজন কফিলের জন্য সান্ডা ধরে দিচ্ছেন। এই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—ইসলামে সান্ডা খাওয়া কি জায়েজ?
সান্ডা একটি মরুভূমিতে বসবাসকারী সরিসৃপ প্রাণী, যা দেখতে অনেকটা গুইসাপের মতো। এটি কোরআন ও হাদিসে ‘দব’ নামে পরিচিত। আরব দেশগুলোতেও একে ‘দব’ বলেই ডাকা হয়।
ইসলামী স্কলার শায়খ আহমাদুলালাহ জানান, সান্ডা খাওয়া নিয়ে তিন ধরনের সহি হাদিস পাওয়া যায়। তিনটিই বিশুদ্ধ হাদিস এবং একে অপরের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হলেও ব্যাখ্যার মাধ্যমে বোঝা যায় পরিস্থিতিভেদে নির্দেশনা আলাদা।
প্রথম হাদিসটি আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত, যেখানে আব্দুর রহমান ইবনে শিবিল থেকে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাকবানার গোশত খাওয়া নিষেধ করেছেন। এখানে ‘নাকবান’ অর্থাৎ সান্ডা খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
দ্বিতীয় হাদিসটি মুসনাদে আহমদে বর্ণিত। এতে বলা হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম কয়েকটি স্থানে দব (সান্ডা) পেয়ে রান্না করেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে তা পেশ করেন। কিন্তু নবী করীম (স.) একে বনু ইসরাইলের একটি শাস্তিপ্রাপ্ত প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করে ফেলে দিতে বলেন। সাহাবারা তা ফেলে দেন এবং পরবর্তীতে আর খাননি।
তৃতীয় হাদিসটি সহিহ মুসলিমে বর্ণিত। এখানে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজির সামনে সাহাবারা বিভিন্ন খাবার খাচ্ছিলেন, যার মধ্যে দবও ছিল। সাহাবারা তা খাচ্ছিলেন, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তা পরিহার করেন। কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেননি।
এই ভিন্ন ভিন্ন সহি হাদিসগুলো বিশ্লেষণ করে ফকীহগণ বিভিন্ন মত পেশ করেছেন। অধিকাংশ ইসলামী চিন্তাবিদ ও ওলামায়ে কেরাম দব বা সান্ডা খাওয়াকে জায়েজ মনে করেন। হানাফী মাজহাব অনুসারে এটি মাকরুহ বা অপছন্দনীয় হিসেবে গণ্য হলেও, মতবিরোধ রয়েছে যে এটি মাকরুহ তাহরিমি (হারামের কাছাকাছি) না কি তানজিহি (কম অপছন্দনীয়)।
হানাফি মাজহাবের অনেক আলেম দব খাওয়াকে মাকরুহ বলে মত দিয়েছেন। তবে এর ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন। কেউ কেউ এটিকে মাকরুহ তাহরিমি বলেছেন, যার মানে এটি হারামের খুব কাছাকাছি, আবার কেউ কেউ মাকরুহ তানজিহি বলেছেন, অর্থাৎ নিরুৎসাহিত কিন্তু হারাম নয়।
সান্ডা খাওয়া নিয়ে ইসলামে কোনো একক সিদ্ধান্ত না থাকায় এটি অনেকটা রুচির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কারো যদি এটি খেতে রুচিতে না লাগে, তবে তিনি না খেলেই পারেন, এবং এতে কোনো গুনাহ হবে না। তবে যারা খাচ্ছেন, তাদের জন্য হারাম বা স্পষ্ট নিষিদ্ধ কিছু নেই—এই মতটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ওলামাদের।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায় একজন প্রবাসী বাংলাদেশি সৌদিতে একজন আরব কফিলের জন্য সান্ডা ধরে দিচ্ছেন। এই ভিডিও ঘিরেই সান্ডা খাওয়া নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিকোণে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে উপরোক্ত হাদিস ও ওলামায়ে কেরামের ব্যাখ্যার আলোকে স্পষ্ট হয় যে এটি একটি ইজতিহাদি বিষয় এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও ব্যক্তির রুচি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, সান্ডা খাওয়া নিয়ে ইসলামি শরিয়তের ব্যাখ্যাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—এটি হারাম বলা যায় না। কিছু হাদিসে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অধিকাংশ হাদিস থেকে অনুমোদন বা ন্যূনতম পরিহার বুঝা যায়। ফলে এটি কারো জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে, আবার কারো জন্য অপছন্দনীয়ও হতে পারে।
তথ্যসূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ
নিউজ র্যাটর ২৪ ঘণ্টা বাংলার খবর