হাসিনার বিরুদ্ধে ১৭ বছর আগের যে অভিযোগের পুনঃতদন্ত করা হবে

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০০৭ সালে দায়ের করা একটি পুরনো অভিযোগ পুনরায় যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট ছিল তাঁর অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে, যার পরিসমাপ্তি ২০০৮ সালে হয় প্রমাণের অভাবে।

সম্প্রতি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার দাখিল করা হলফনামা খতিয়ে দেখে দুদক তাতে সম্পদের বিষয়ে অসঙ্গতি খুঁজে পায়। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছে দুদক, যাতে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এক ব্রিফিংয়ে বলেন, “নির্বাচনী হলফনামায় অসত্য তথ্য দেওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। শেখ হাসিনার হলফনামায় উল্লেখিত সম্পদ এবং ২০০৮ সালের আয়কর বিবরণী মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন, “এটি দুদকের নিয়মিত কাজের অংশ। এখানে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। আমরা কোনো রাজনৈতিক চাপ অনুভব করিনি।”

জানা গেছে, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়ে। সে সময় তিনি দুদকের চিঠির জবাবে সম্পদ বিবরণী জমা দেন। তবে প্রমাণের অভাবে অভিযোগটি ২০০৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা তাঁর ২০০৮ সালের হলফনামায় নিজ নামে ৬.৫০ একর কৃষিজমির কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং এর মূল্য দেখিয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, তাঁর নামে তখন ২৮.৪১ একর জমি ছিল, যার মধ্যে ক্রয় করা জমির মূল্য ছিল ৩৩ লাখ ৬৬ হাজার ১০ টাকা। এতে দেখা যাচ্ছে, তিনি ২১.৯১ একর জমির তথ্য গোপন করেছেন এবং মূল্য কম দেখিয়ে হলফনামায় অসত্য তথ্য দিয়েছেন।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা তৎকালীন সংসদ সদস্য ডা. মোহাম্মদ সিরাজুল আকবরের শুল্কমুক্ত কোটা ব্যবহার করে বেনামে একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি আমদানি করেন, যার বাজারমূল্য ছিল ১ কোটি ৯৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। গাড়িটি তাঁর নিজের ঠিকানা ‘সুধা সদন’ ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন করা হয় এবং তিনি তা নিজেই ব্যবহার করেন। এই গাড়ি সম্পর্কে ডা. সিরাজুল আকবরের আয়কর নথি বা হলফনামায় কোনো তথ্য ছিল না।

২০০৭-০৮ সালে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নাইকো, মিগ-২৯ ক্রয় ও বাড়ি সজ্জিতকরণে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আদালতের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা একে একে প্রত্যাহার হয়।
অন্যদিকে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টসহ একাধিক মামলা দীর্ঘদিন চলমান ছিল এবং তাঁকে কারাবরণসহ নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরই কেবল তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০০৭-০৮ সালের মামলাগুলো ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র অংশ ছিল, যার মাধ্যমে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই শীর্ষ নেতাকে রাজনীতি থেকে সরাতে চেয়েছিল।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর আওতায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। এতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে সম্পদ গোপনের তথ্য এবং বেনামে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির অভিযোগ।

তথ্যসূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ

Leave a Reply