গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, বাংলাদেশসহ অনেক দেশে প্রচলিত ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ (FPTP) পদ্ধতিতে এই প্রতিফলন অনেক সময় অসম ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়। এমনকি কোনো রাজনৈতিক দল অল্প সংখ্যক ভোট পেয়েও বিপুল সংখ্যক আসনে জয়ী হয়, অন্যদিকে অধিক ভোটপ্রাপ্ত দল সংসদে ন্যূনতম প্রতিনিধিত্বও পায় না।
এমন বৈষম্যের উদাহরণ ইতিহাসেই রয়েছে। যেমন ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ৪০.৮৬% ভোট পেয়ে ১৯৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল, যেখানে আওয়ামী লীগ ৪০.২২% ভোট পেয়েও মাত্র ৬২টি আসন পায়। একইভাবে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ৪৮.০৪% ভোট পেয়ে ২৩০টি আসন লাভ করলেও বিএনপি ৩২.৫০% ভোট পেয়েও পায় মাত্র ৩০টি আসন।
এই চিত্র প্রমাণ করে যে, প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। যার ফলে দেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন পদ্ধতি (PR) কী?
এ সমস্যা সমাধানে অনেক দেশে প্রবর্তিত হয়েছে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (Proportional Representation – PR) নির্বাচন পদ্ধতি। উইকিপিডিয়ার মতে, এই পদ্ধতিতে ভোটারদের রায় প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট প্রাপ্তির হার অনুযায়ী।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো দল ১০% ভোট পায়, তাহলে সংসদে তাদের আসনসংখ্যাও হবে প্রায় ১০%। এর ফলে কোনো দলই অসমভাবে বেশি আসন পায় না এবং জনগণের কণ্ঠস্বর যথাযথভাবে সংসদে প্রতিফলিত হয়।
বাস্তবতা ও উদাহরণ
ধরা যাক, চারটি দল একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং এক প্রার্থী মাত্র ২৫% ভোট পেয়েছেন, বাকি তিন প্রার্থী মিলিয়ে পেয়েছেন ৭৫%। FPTP পদ্ধতিতে ২৫% ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীই জয়ী হবেন, অর্থাৎ ৭৫% ভোটের কোনো কার্যকর প্রতিফলন ঘটবে না।
অন্যদিকে, PR পদ্ধতিতে সব দলের মোট ভোট হিসেব করে আসন বরাদ্দ হলে সকলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য পন্থা।
পিআর পদ্ধতির বৈশ্বিক ব্যবহার
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রথম চালু হয় ১৮৯৯ সালে বেলজিয়ামে। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে ৯১টি, অর্থাৎ ৫৪% দেশ এই পদ্ধতিতে নির্বাচন পরিচালনা করে।
উন্নত দেশের সংগঠন ওআইসিডি’র (OECD) ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টি, প্রায় ৭০% দেশ PR পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
পিআর পদ্ধতির ধরন
আনুপাতিক নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি বিদ্যমান। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি হলো:
- মুক্ত তালিকা পদ্ধতি: দলগুলো ভোটের ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত প্রার্থীদের মধ্যে থেকে আসন পায়।
- বদ্ধ তালিকা পদ্ধতি: দল আগে থেকেই ঠিক করে দেয়, কোন প্রার্থী সংসদ সদস্য হবেন।
- মিশ্র পদ্ধতি: কিছু আসনে প্রচলিত প্রতীকভিত্তিক নির্বাচন হয়, আর কিছু আসনে আনুপাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতি চালুর ভাবনা
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপের সময় কিছু রাজনৈতিক দল এই পদ্ধতির পক্ষে মতামত দিয়েছে। তারা মনে করেন, বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় বিরাট বৈষম্য বিরাজ করছে এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য PR পদ্ধতি চালু করা উচিত।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বার্তা
বিশ্বের বহু উন্নত দেশে PR পদ্ধতির বাস্তবায়নের ফলে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব এবং সরকার গঠনে স্বচ্ছতা এসেছে। বাংলাদেশেও যদি এই পদ্ধতি চালু করা হয়, তবে রাজনীতিতে বৈচিত্র্য ও সমতার ভিত্তি তৈরি হবে।
উপসংহার
গণতন্ত্রের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে হলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এতে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দলের আধিপত্যই নয়, বরং সব শ্রেণি ও মতাদর্শের মানুষের কণ্ঠস্বর সংসদে প্রতিফলিত হবে।
বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনের বৈষম্যমূলক ফলাফল এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এ পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনার সময় এখনই। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এটি হতে পারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ
নিউজ র্যাটর ২৪ ঘণ্টা বাংলার খবর