১০ দিনে যেভাবে বন্ধু থেকে শত্রু বনে গেলেন ট্রাম্প-মাস্ক!

দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়লাভের পর হোয়াইট হাউজে এক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠেন টেসলা ও স্পেসএক্স প্রধান ইলন মাস্ক। এতটাই ঘনিষ্ঠতা ছিল যে, অনেকেই তাদের সম্পর্ককে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ব্রোম্যান্স’— অর্থাৎ বন্ধুত্বের সঙ্গে রোমান্টিক উষ্ণতা মেশানো এক সম্পর্ক। কিন্তু গত কয়েকদিনে সেই সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক বিল।

সবকিছুর শুরু ২৮ মে। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন মাস্ক। তার দাবি, বিলটির কিছু দিক ছিল অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ও অগ্রহণযোগ্য। যদিও ট্রাম্প পরদিন বলেন, তিনি পুরোপুরি বিল নিয়ে সন্তুষ্ট নন, তবে করছাড়ের বিষয়টি নিয়ে ‘খুশি’।

এই মন্তব্যের পরদিনই, ২৯ মে মাস্ক পদত্যাগ করেন ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (ডোজ)’ থেকে, যেখানে তিনি ছিলেন প্রধান। ৩০ মে হোয়াইট হাউজে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে মাস্ক জানান, তার বিদায় হলেও ভবিষ্যতে হোয়াইট হাউজে যাতায়াত অব্যাহত থাকবে। ট্রাম্পও সেই সময় মাস্কের প্রশংসা করেন।

২ জুন ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ বিলের সমর্থনে পোস্ট দেন। পরদিন মাস্ক পাল্টা আক্রমণ করে বিলটিকে বলেন “অতিরিক্ত খরুচে”, “লজ্জাজনক কাণ্ড” এবং “ঘৃণামূলক বিকৃতি”। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক ও উত্তেজনা চরমে ওঠে।

৪ জুন মাস্ক তার অনুসারীদের আহ্বান জানান কংগ্রেস সদস্যদের ফোন দিয়ে বিলটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। একই দিনে তিনি একটি নতুন ব্যয়বহুল কিন্তু বাজেট ঘাটতি ও ঋণসীমা না বাড়ানোর বিল প্রস্তাবের আহ্বান জানান।

৫ জুন ওভাল অফিসে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎর্স-এর পাশে ট্রাম্প বলেন, মাস্কের সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘ভালো ছিল’, তবে এখন তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তার দাবি, মাস্ক বৈদ্যুতিক গাড়ির ভর্তুকি কমানোর কারণে অসন্তুষ্ট।

মাস্ক সঙ্গে সঙ্গে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ পাল্টা পোস্ট দেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাকে কোনো বিল দেখানো হয়নি এবং বিলটি গভীর রাতে এত দ্রুত পাস হয়েছে যে কংগ্রেস সদস্যরাও তা পড়েননি। তিনি বিলটিকে দায়ী করেন বাজেট ঘাটতিকে ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

ওই দিন ট্রাম্প আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, মাস্ক হোয়াইট হাউজে থাকাকালীন ‘অসহনীয়’ হয়ে উঠেছিল। তিনি ঘোষণা করেন, ইলেকট্রিক গাড়ির বাধ্যতামূলক নীতিমালা বাতিল করবেন। এ ছাড়া মাস্কের কোম্পানির ভর্তুকি ও চুক্তি বাতিলই হবে বাজেট সাশ্রয়ের সবচেয়ে সহজ উপায়।

এর জবাবে মাস্ক ঘোষণা দেন, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত ড্রাগন স্পেসক্রাফট কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হবে।

মাস্ক পরে ট্রাম্পের নাম ‘এপস্টাইন ফাইল’-এ থাকার অভিযোগ তুলে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেন। এই ফাইলটি যুক্তরাষ্ট্রের যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের বিরুদ্ধে তদন্তের সময় সংকলিত হয়।

ট্রাম্প অবশ্য পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেন ট্রুথ সোশ্যালে। বলেন, “মাস্ক আমার বিরুদ্ধে যাই বলুক, আমি কিছু মনে করি না।” তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাজেট কাটছাঁটের সবচেয়ে সহজ পথ ইলনের কোম্পানির কন্ট্রাক্ট বাতিল করা।

৬ জুন মাস্ক শান্তির ইঙ্গিত দেন, বিল আকম্যানের একটি মন্তব্য শেয়ার করে লিখেন, “আপনি ভুল বলেননি।” যদিও ট্রাম্প এই নমনীয়তা আমলে নেননি। তিনি এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাস্ককে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ ব্যক্তি বলেও আখ্যায়িত করেন। তার ভাষায়, “মাস্কের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ আমার বিশেষ নেই।”

এখন প্রশ্ন হচ্ছে— যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ রাজনৈতিক ক্ষমতা আর বিশ্বসেরা ধনীর এই দ্বন্দ্ব কোথায় গিয়ে শেষ হবে? যেভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতপার্থক্য বড় আকার নিচ্ছে, তাতে করে ভবিষ্যতে এই ‘ব্রোম্যান্স’-এর পুনরুত্থান কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বিশ্লেষকদেরও সন্দেহ।

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক কালের কণ্ঠ

Leave a Reply